রূপগঞ্জ(নারায়ণগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ
এক সময় বাবার সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ডিম বিক্রি করতেন তিনি, এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন ‘আন্ডা রফিক’ নামে। সেই সাধারণ ডিম বিক্রেতা থেকে জালিয়াতি ও পেশিশক্তির জোরে রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক আজ শত শত কোটি টাকার মালিক। তবে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেরিয়ে আসছে তার সাম্রাজ্য বিস্তারের রোমহর্ষক সব কাহিনী।
ক্ষমতার দাপট ও উত্থান অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রফিক। এরপর থেকেই তার প্রভাব বলয় বাড়তে থাকে। গড়ে তোলেন ‘রংধনু গ্রুপ’ নামক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও শামীম ওসমানের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি রূপগঞ্জে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেন।
জমি দখল ও প্রতারণার জাল কায়েতপাড়ার নিরীহ মানুষ ও বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের জমি দখল করে আবাসন কোম্পানির কাছে বিক্রি করাই ছিল তার আয়ের মূল উৎস। ভুয়া দলিল তৈরি এবং একই জমি একাধিকবার বিক্রির মাধ্যমে তিনি হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে ‘পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতি’র কাছে সাড়ে সাত একর জমি বিক্রির পর একই বছরের জুনে সেই জমির একাংশ পুনরায় ‘ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট এর কাছে বিক্রি করে বড় ধরনের জালিয়াতি করেন।
অর্থ পাচার ও বর্তমান অবস্থা শুধু জমি দখলই নয়, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ভুয়া কার্যাদেশ দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে রফিকের বিরুদ্ধে। তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র অ্যান্টিগুয়া এবং বারবুডায় বিশাল বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।
বর্তমানে সিআইডি তার বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করেছে। আদালতের নির্দেশে তার ১৩টি ব্যাংক হিসাবের প্রায় ১৭ কোটি টাকা এবং যমুনা ফিউচার পার্কে থাকা এক লাখ বর্গফুটের বিশাল বাণিজ্যিক স্পেস ক্রোক করা হয়েছে। সরকার পতনের পর রফিক দেশ ছাড়ার পর এলাকার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসলেও বর্তমানে পুলিশ পাহানায় এলাকায় আসার খবরে এলাকায় ফেরার গুঞ্জনে এলাকাবাসীর মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, অতি দ্রুত এই ভূমিদস্যুকে আইনের আওতায় এনে সাধারণ মানুষের জমি ও অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া হোক। নাওড়া এলাকার নিহত শিশু স্বাধীনের পিতা শাহীনুর মিয়া বলেন, আমার বাবার কাছে জোর করে জমি চাইছিল আমার বাবা জমি না দেওয়ায় আমাকে মারধর ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায়ে আমার ছেলেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করে, পরে নির্যাতন করে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
এ ঘটনায় আমরা খিলগাঁও থানায় মামলা করতে গেলে ৮ জনের নাম দিলেও ‘রফিক’ নাম থাকায় পুলিশ মামলা নেয়নি। তারা জানায়, রফিকের নাম বাদ দিলে মামলা নেওয়া হবে, কিন্তু তার নাম থাকলে মামলা নেওয়া যাবে না।
পরে আমাদের বাইরে যেতে বলে ভেতরে রফিককে ফোন করা হয় এবং মামলা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা আদালতে গিয়ে মামলা দায়ের করি। এ মামলার চার্জশিট এখনো দেয়নি। আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।
নাওড়া এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আন্ডা রফিক মনে করেন আগে অয়, ওর বাপে ডিম বেচত। ওইও ডিম বেচত। ওর বাপে কিনা কিনা দিত ডিম, পাড়ায় পাড়ায় মহল্লাতে ডিম কিনা দিত। ওই ডিম নিয়া বেচত। ডিম বেচতে বেচতে এরপরে গিয়া দুই নম্বর ফলের দোহান কিনল। এই ফলের দোহান করতে করতে এরপরে গাজির পাছ ধইরা, গাজির পাছ ধইরা গিয়া অয় যেভাবে হোক এই জোর-জবরদস্তি কইরা গাজির হাত-পা ধইরা গিয়া চেয়ারম্যান অইয়া গেল। চেয়ারম্যান হইছে ইলেকশনে চেয়ারম্যান দিয়া দিল। চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেইকা হাজার হাজার কোটি টাকার মাইনষের সম্পত্তি জোর-জবরদস্তি কইরা দখলে নিতো। এ জোর-জবরদস্তি কইরা হাত দিয়া এই জায়গা-সম্পত্তির মালিক হইয়া হাজার হাজার কোটি টাকার, বিলিয়ন বিলিয়ন কোটি টাকার মালিক হইয়া রইছে। অরে কেউ কিছু করতে পারে না। আইন-প্রশাসনেও কিছুই করতে পারে না। সব টাকা দিয়া সব ভুলায় ফেলায়।
সে আওয়ামী লীগও করছে এহন আবার বিএনপির মইধ্যে যোগ দিয়া ওই আবার এই জায়গাসম্পত্তি দখল করার পায়তারা করতাছে ।
নাওড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সেক্রেটারী জানান, রেজিস্ট্রি অফিস থেকে কমিশনার পাস আমাদেরকে রফিকের অফিসে নিয়ে গিয়ে । বলতাছে যে মসজিদের এই জমি লাগবো, রেজিস্ট্রি কইরা দাও। তো আমরা বললাম যে কবরস্থান এবং ঈদগাহর জমি আমরা কীভাবে ওয়াকফা ছাড়া রেজিস্ট্রি কইরা দিমু? এইটা সমাজের সাথে কোনো কথা নাই, বার্তা নাই, কোনো মানুষ জানে না। তো আমরা রেজিস্ট্রি কইরা দিয়া আমরা কি সমস্যা পরমু, ফাঁসমু? তখন বলছে রেজিস্ট্রি এই মুহূর্তে দিবি। না দিলে সমস্যা হইব। আর অন্যদিকে আমি ঈদগাহ কইরা দিমু, কবরস্থানের মূল্য দিমু। কিন্তু এইরকম হুমকি দিয়া রেজিস্ট্রি কইরা নিছে। আজ পর্যন্ত আমাদের কোনো এই ঈদগাহও পাইলাম না, কোনো মূল্যও পাইলাম না।
রফিকের অত্যাচারে শিকার হওয়া এক নারী বলেন, রফিক আমাদেরকে বলে আমাদের জমি তাকে লিখে দিতে। আমরা জমি দেওয়ার অস্বীকার করি। এর কিছুদিন পর রফিক ও তার ভাই মিজানের নির্দেশ্যে একশর মতো লোক আইসা বাড়িঘর ভাংচুর করে লুটপাট কইরা লইয়া গেছে। আবার ট্যাকা-পয়সা নিছে, ঘর-জিনিসপত্র নিছে। এক একশ গর্তের খ্যাতা-কাপড় সব লইয়া গেছেগা। বেকুব দা উডাইয়া এক্কবারে সব জিনিসপত্র লুটপাট কইরা এক মাস ধরে বেকু দিয়ে ভাঙছে। ভাইঙ্গা এক্কবারে সব লইয়া এক্কবারে মাটি কইরা ওরা গেলো গা। অহন আমি ঠিক মনে করেন অহন যে থাকতাছি, অহন হুনতাছি চেয়ারম্যান আইবো। অহন চেয়ারম্যান আইলে এলা আমরা আতঙ্কিত আছি, ডরাইতাছি, না জানি হ্যায় আইয়া আবার কী করে। এইডাতো আর কইতারতাম না। অহন ক্যামনে থাকমু আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাই। সে যেন এলাকায় না আসতে পারে। সে আসলে আমাদের আবারও ক্ষতি করবে।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানার ওসি মোঃ সবজেল হোসেন বলেন, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। জামিনেও আছে। কতগুলো মামলা এ বিষয়ে দেখে বলতে হবে। রফিক প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এ বিষয়ে তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন।
























