মেহেদী হাসান ,জামালপুর প্রতিনিধি:
জামালপুরের ১১ নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি বীর প্রতীক-বার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে হৃদযন্ত্রে ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি ৩ ছেলে ও ৩ কন্যাসহ অসংখ্য গুণগাহী রেখে গেছেন।
তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বকশিগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন।
তিনি জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি বীর প্রতীক বার জামালপুরের বকশিগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রাবাজ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আব্দুল গফুর মিয়া কৃষক ছিলেন। বর্তমানে তিনি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী পৌর শহরের খামারীয়া পাড়া মহল্লার বাসিন্দা।
১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর ১১ নং সেক্টরের ধানুয়া কামালপুর দখলের পর জামালপুর শহরের পাকিস্তানি অবস্থানে হামলার প্রস্তুতি চলছিল। ৩১ বেলুচের প্রায় দেড় হাজার সেনা পিটিআই ক্যাম্পে স্থাপিত প্রতিরক্ষা অবস্থানে ছিল। এই অবস্থান উচ্ছেদ না করে মিত্রবাহিনীর টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে অভিযান পরিচালনা করা এক অর্থে অসম্ভব ছিল। এ অবস্থায় শত্রুপক্ষের মনোভাব জানতে মিত্রবাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে চিঠি লেখেন পাকিস্তানি অধিনায়কের কাছে। কিন্তু এ চিঠি নিয়ে কে যাবেন? জহুরুল হক মুন্সী তখন ভারতের পুরাখাসিয়া ক্যাম্পে ছিলেন। এ দায়িত্ব গ্রহণে তিনি স্বেচ্ছায় রাজি হলেন।
৯ ডিসেম্বর তিনি সাদা পতাকা উড়িয়ে সাইকেলে চড়ে রওনা হলেন জামালপুরের দিকে। পিটিআই ক্যাম্পে যাওয়ার পথে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে আটক করে চোখ ও হাত বেঁধে নিয়ে যায় তাদের অধিনায়কের কাছে। চিঠি বহনের অপরাধে তাঁর ওপর শুরু হয় অকথ্য নির্যাতন। এসএমজির বাঁটের আঘাতে মুন্সীর মুখের ওপরের পাটির চারটি দাঁত ভেঙে যায়। রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁর পা ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁকে শূন্যে ঝুলিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করা হয়। এরপর পাকিস্তানি অধিনায়ক ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ারের চিঠির জবাব লিখে সেই চিঠির ভেতর রাইফেলের গুলি ভরে মুন্সীকে ফেরত পাঠায়। ওই দিনই গভীর রাতে মুন্সী পৌঁছান মিত্রবাহিনীর ক্যাম্পে। পরদিন ১০ ডিসেম্বর ভোরে মিত্রবাহিনী জামালপুরের পাকিস্তানি ক্যাম্পে আঘাত হানে। জহুরুল হক মুন্সির নেতৃত্বে মুক্ত হয় জামালপুর। ১৯৭৩ সালে সরকার তাকে বীর প্রতীক সম্মাননা প্রদান করেন।
জামাত নেতা যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের মামলার অন্যতম স্বাক্ষীও ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী বীর প্রতীক বার।
সরকার কোনো যোদ্ধাকে যুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতির জন্য একই পদক দুইবার প্রদান করলে তার নামের শেষে ‘বীরত্ব’ উপাধি লেখার পর প্রথম ব্রাকেটে ‘বার’ লেখার নিয়ম স্বীকৃত। ১৯৭১ এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে―’জহুরুল হক মুন্সী’ই একমাত্র এই বিরল উপাধি পাওয়া বীরপুত্র!

































Discussion about this post