মনিরুজ্জামান মনির,যশোর জেলা প্রতিনিধি,
মানুষ ফিরেছে পলিথিনের ব্যবহারে। প্রতিটা দোকান থেকে ছোট বড় যা কিছু কেনা হোক দোকানিরা ক্রেতাদের পলিথিনের শপিং ব্যাগে ভরে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে। ২০ বছর আগে বাজারে ছিলো কালো পলিথিন। কিন্তু বর্তমানে সেটার বিপরিতে আসছে হালকা সবুজ রঙ্গের পলিথিন। খাবর থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটা পন্য বহন হিসাবে ব্যবহান হচ্ছে পলিথিনের ব্যাগ। শহর এবং গ্রামের মানুষের পলিথিনের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়েছে। মনে হচ্ছে পলিথিনের ব্যাগই একমাত্র বহন হিসাবে কাজ করছে। যশোরের অধিকাংশ বাজারে দেখা মিলছে পলিথিনের ব্যাগ হাতে বিভিন্ন পন্য নিয়ে চলছে মানুষ। বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণে বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে। পলিথিন ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, ১০-২৫ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে পলিথিনের ব্যবহার। আমাদের সবুজ নগরায়ণ গড়তে হলে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় এ্যাকশন প্লান বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ অনেক প্লাস্টিক আছে যা ৫০ বছরেও পচে না। ২০০২ সালের আইন অনুযায়ী ২১ বছর পার হলেও তা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বরং পলিথিনের ব্যবহার বেড়েছে কয়েকগুন।
বাংলাদেশে ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫-অনুযায়ী পলিথিনের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার, উৎপাদন, বিপণন এবং পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পরিবেশ আইনের ১৫ ধারায় রয়েছে, নিষিদ্ধ পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড হবে এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানাসহ উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।
২০০৫ সালে সারা দেশে পলিথিনের ব্যবহার ছিলো পার ক্যাপিটা ৩ কেজি। ২০২০ সালে বেড়ে দাড়ায় পার ক্যাপিটা ৯ কেজি। ঢাকাতে ব্যবহার হতো ৯.২ কেজি বর্তমানে ২২.২৫ কেজি। এতে বছরে জিডিপিতে ক্ষতি হচ্ছে ৩.৪ শতাংশ। ঢাকার জিডিপিতে ক্ষতি ০.৭ শতাংশ। বায়ু আর পানি দূষণের কারণে বছরে দেশে মারা যাচ্ছে ২৮ শতাংশ মানুষ।
স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি পলিথিন এবং প্লাস্টিক’র চারটি ধাপ হাতে নেয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ ব্যবহার কমানো হবে। ২০২৬ সালের মধ্যে একবার ব্যবহারিত হয় এমন পলেথিন ৯০ ভাগ কমানো হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ ভাগ রিসাইক্লিং করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ ভাগ করা হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ ভাগ প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন কমিয়ে আনা হবে।
যশোর বেজপাড়ার মোজাম্মেলকে দেখা যায় সবুজ রঙ্গের পলিথিনের শপিং ব্যাগে বিভিন্ন পন্য সামগ্রী নিয়ে পথ চলতে। এ সময় তার নিকট পলিথিন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন দোকান থেকে কোন কিছু কেনাকাটা করলে পলিথিনের ব্যাগে ভরে দেয়। আসলে আমাদেরও এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিৎ। আগের মতো অভিজান করে পলেথিনের ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন।
আ. মজিদের পলিথিনের শপিং ব্যাগ হাতে চলতে দেখা যায়। পলিথিন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, আগের মতো এখন আবার বাজারে পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে গেছে। খাবার থেকে শুরু করে প্রতিটা জিনিস-পত্রের বহন হিসাবে বর্তমানে পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। কয়েকটি মিষ্টির দোকানে নেটজাল দেখা যায়। তাও আবার দৈই কিনলে দেয়। তাছাড়া প্রতিটা দোকানেই পলিথিনের ব্যাগ রয়েছে।
নাহিদ হাসান জানান, আসলে আমরা যেখান থেকেই যা কিনি সেখান থেকেই পলিথিনের ব্যাগে ভরে হতে ধরিয়ে দেয়। এখানে পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হলে তৈরি কৃত কারখানা বন্ধ করতে হবে। পলিথিন আমাদের নিকট সহজলব্ধ হয়েছে। যার কারণে এর ব্যবহার বেশি। এ বিষয়ে প্রশাসনকে কঠিন হতে হবে।
দড়াটানার ভৈরব হোটেলের মালিক জুয়েল হোসেন জানান, নেটজালের ব্যাগের ব্যবহার তেমন বেশি পাবেন না আপনি। প্রতিটা হোটেল বা দোকানে দেখবেন পলিথিনের ব্যবহার। আমরাও অনেক দিন থেকে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করে থাকি।
নিউ ভৈরব হোটেলের রাসেল জানান, নেটজাল আগের মতো পাওয়া যায় না। আর যা পাওয়া যায় তার দামও অনেক বেশি। আগে দোকানে নেটজাল দিয়ে যেতো। এখন তারা আর আসে না। আমরা অনেক দিন থেকে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার করছি। তেমন কোন সমস্যা হয় না।
বড় বাজারের মায়া স্টরের প্রকাশ দত্ত জানান, আমরা নেটজাল ব্যবহার করি না। পলিথিনের ব্যাগই ব্যবহার করে থাকি। পলিথিনের থেকে নেটজালের দাম অনেক বেশি। এমন কি তাকে পলিথিনে মদিদোকানের জিনিস বিক্রি করতেও দেখা যায়।
পুজা ষ্টরের গোপাল জানান, নেটজাল বাজারে এখন পাওয়া যায় না। পলিথিন বাজারে ভরপুর পাওয়া যায় এবং দামও কম। যার কারণে সবাই ব্যবহার করি।
এমএম কলেজের ভূগল এবং পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নীতিশ চন্দ্র কর্মকার বলেন, প্লাস্টিক সূর্যের তাপে মাক্রপ্লাস্টিকে রুপান্তিরিত হয়। আর এর ফলে সহজেই মাছের পেটে প্রবেশ করে। আর ঐ মাছ খায়ার সাথেই আমাদের পেটে প্লাস্টিক প্রবেশ করে থাকে। যার ফলে ক্ষুদা-মন্দা দেখা দেয়। হজম শক্তি কমে যায়। প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়। এদিকে পলিথিনে মাঠির উর্ববর্তা কমে যায়। মাঠিতে পানির ধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যার ফলে কৃষি উৎপাদিত ফসলের ফলন কমে আসে। পলিথিনের কারণে সূমুদ্রের তলদেলের শৈয়বাল গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুর আলম বলেন, যেটা অবৈধ সেটা বৈধ করার কোন সুযোগ নেই। পলিথিন শুধু পরিবেশ দূষনই করে না । এটা মানুষের শরিরের জন্য ব্যপক ক্ষতি বয়ে আনে। জেলা প্রশাসক অনুমতি দিলেই আমরা অভিজান চালাতে পারি। যশোর জেলার পলিথিন অন্য জেলা থেকে আসে। যশোরে কোন পলিথিন তৈরির কারখানা নেই। আমরা সব সময় মানুষকে সচেতন করার চেস্টা করি পলিথিন বা প্লাস্টিক থেকে প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার না করার। আপনি দেখেন আমাদের স্টর রুমেও বিভিন্ন জায়গা অভিজান করে পলিথিনে ভরা রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদুল আলম বলেন, পলিথিন হাতে ঝুলিয়ে শপিং ব্যাগ হিসাবে ব্যবহার করা দন্ডনিয় অপরাধ। ২০০২ সালে পলিথিন ব্যবহারে ব্যাপক অভিজান হয়েছে। বর্তমান যে পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে গেছে। আমার ভালো ধারণা ছিলো না। অব্যশই আমরা ডিসি স্যারের সাথে আলোচনা করে অভিজান চালাবো। নেটজালের ব্যাগের দাম বৃদ্ধির কথা বললে তিনি বলেন দাম বেশি কমের বিষয় না । পলিথিন অবৈধ সেটা দাম বেশি হোক আর কম হোক।
























